৫ বছর পর জেল থেকে বের হচ্ছি।
এই ৫ বছরে আমার সাথে একটি বারের জন্যও কেও দেখা করতে আসেনি।বাড়িতে আমার মা বাবা বোন সবাই আছে।কিন্তু কেও আসেনি আমার সাথে দেখা করতে।
আমার সবচেয়ে আপনজন জান্নাত ও একটি বারের জন্য দেখা করতে আসেনি।
ভাবলাম যে জেল থেকে বের হয়ে হয়তো কারো দেখা পাবো।কিন্তু না আমার ধারণা ভুল।
আমার বন্ধু বান্ধব আত্বীয় স্বজন এবং কি আমার বাবা মা বোন কেও আমাকে নিতে আসেনি।
এই ৫ বছরে জান্নাত একটি বারের জন্যও আমার খবর নেয়ার জন্য আসেনি।
জিবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার সামনে আমি দাঁড়িয়ে।
জেল থেকে বের হয়েছি। এখন আমি কোথায় যাবো সেটা ভেবে অস্থির হয়ে যাচ্ছি।
এখন কি জান্নাতের বাড়িতে যাবো নাকি আমার নিজের বাড়িতে যাবো মাথায় কিছুই আসতিছে না।
সব কিছু ভেবে চিন্তে ডিশিসন নিলাম যে আগে আব্বু আম্মুর সাথে দেখা করতে যাবো।
আবার মনে মনে ভাবছি আব্বু আম্মু আমাকে দেখে কি খুশি হবে নাকি ধুর ধুর করে তাড়িয়ে দিবে।
যাই হোক সব ভুলে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
সেই চিরো চেনা চিরোপরিচিত বাসাটিতে যেয়ে দেখি বাসায় আমার আব্বু আম্মু বোন কেও নেই।
তারা কোথায় গেলো?
এখন সে বাসায় যারা থাকে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করলাম এখানে আগে যারা থাকতো তারা কোথায়?
ভদ্রলোক উত্তর দিলো ছেলের কারণে তারা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছে।তারা যেই কয়দিন এখানে ছিলো প্রতিনিয়ত এখানকার লোকজন তাদেরকে তাদের সন্তানের জন্য অপমান করতো।
সেই অপমান সহ্য করতে না পেরেই তারা এখানে সব কিছু বিক্রি করে তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছে।
আমি ভদ্রলোক কে আমার পরিচয় না দিয়েই সেখান থেকে চলে যাই।
এখন আর গ্রামের বাড়িতে যাওয়া সম্ভব না তাই সিধান্ত নিলাম এখন জান্নাতের কাছে যাবো।
জান্নাতের সাথে আমার ৫ বছরের সম্পর্ক ছিলো।
জান্নাতের বাড়ির কাছে আসতেই দেখি সেখানে জান্নাতের বাবা মা জান্নাত কেও নেই।
যে ছিলো তাকে জিজ্ঞেস করলাম এখানে আগে যারা ছিলো তারা কোথায় বাড়ির মালিক উত্তর দিলো তাদের মেয়ে শহরের নাম করা ডাক্তার হয়েছে।
তারা এখন আর এ বাড়িতে থাকে না।
তারা বাড়ি পাল্টে নতুন বাড়িতে গিয়ে উঠেছে।তার কাছে জান্নাতরা এখন যেখানে থাকে সে বাড়ির ঠিকানা চাইলাম।কিন্তু কোনো লাভ হলো না কারণ তার কাছে জান্নাতের কোনো ঠিকানা ছিলো না।
শত দুঃখ কষ্টের মাঝের খুশীর খবর হলো এইযে যে কারণে আমার ৫ বছর জেল খাটতে হয়েছে আমার সে উদ্দেশ্যে সফল হয়েছে।
জান্নাত শহরের নাম করা বড় ডাক্তার হয়েছে এটা শুনেই আমি সব কষ্ট ভুলে একটু চাপা হাসি দিলাম।
এখন জান্নাতের কথা বাদ দিয়ে আমি যাদের জন্য জীবনে কোনো কিছুই করতে পারিনি তাদেরকে এক নজর দেখার জন্য গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
আমাদের গ্রাম চাঁদপুর।
চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর যাওয়ার জন্য টিকিট কেটে বাসে উঠি।
অবশ্য টিকিটের টাকা সহ আরো কিছু টাকা আমার বন্ধু সরোয়ারের সাথে দেখা করে ওর কাছ থেকে নেই।
বাসে কিরে যাচ্ছি বাড়ির উদ্দেশ্যে ৫ বছর পর আবার তাদের সাথে দেখা হবে।
তারা আমাকে দেখে কি বলবে কি করবে আমাকে কী তারা মেনে নিবে নাকি দূর দূর করে তাড়িয়ে দিবে এগুলো ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছি খেয়াল নেই।রাতের জার্নি তাই অল্পতেই ঘুম চলে এসেছিলো।
বাস এসে চাঁদপুর বাস স্টেশনে থামলো।
বাসের কনন্ট্রাক্টরের ডাকে আমার ঘুম ভাঙলো।
সে বল্লো ভাইজান চাঁদপুর এসে গেছি আপনে কি নামবেন না গাড়িতেই থাকবেন।
আমি তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে আমার ব্যাগটি নিয়ে সোজা বাস থেকে নেমে চলে আসি।
চাঁদপুর থেকে আমাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য সি এন জিতে উঠতে হবে। যথারিতি সি এন জিতে করে চাঁদপুর থেকে মতলব আসলাম।
এর পর নারায়নপুর। লাস্ট আশ্বিনপুর এসে পায়ে হেটে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
হাটছি আর ভাবছি বাবা মা বোন কি এই অপরাধী কে তাদের ঘরে ঠাই দিবে।
নাকি দূরে ঠেলে দিবে। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই বাড়ির সামনে চলে আসলাম।
এসে আম্মু বলে ডাকতেই ঘর থেকে কে জেনে বলে উঠলো কলি দেখতো কে এসেছি।
কলি আমার বোনের নাম। কলি বাহিরে এসে আমাকে দেখেই হতবম্ব হয়ে গেলো।
সে কি বলবে কি করবে কিছুই বুজতিছে না।সে জোড়ে জোরে চিৎকার করতে লাগলো আম্মু আব্বু জলদি বাহিরে এসো দেখে যাও কে এসেছে।
খুব দ্রুতই আম্মু আর আব্বু ঘর থেকে বের হয়ে আসলো। তারা আমাকে দেখে অনেক অনেক অবাক।
কারণ টা হলো এই যে আমার জেল থেকে বের হওয়ার কথা আরো ৩ বছর পর কিন্তু এতো তারাতারি কিভাবে বের হয়ে আসলাম তারা হয়তো এটিই চিন্তা করছে।
আম্মু আমার নাম ধরে ডাক দিয়ে বল্লো বাবা সজীব তুই? তোরতো আরো ৩ বছর পর আসার কথা।
আমি আম্মুকে বল্লাম জেল হাজতে আমার ভালো ব্যাবহার ও ভালো!
কাজকর্মের জন্য তারা আমাকে ৩ বছর আগেই মুক্তি দিয়ে দিয়েছে। আব্বুও আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে বল্লো বাবা কেমন আছিস তুই??
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।তারা বুজতে পেরেছে যে আমি তাদের উপর অভিমান করে আছি।
এরপর বাবা বল্লো আয় ঘরে আয় কেনো আমরা শহর ছেড়ে গ্রামে এলাম। কেনো একটি বারের জন্য তোকে জেল হাজতে দেখতে গেলাম না এই সব প্রশ্নের উত্তর দিবো।
ঘরে আয়,আগে তুই কিছু খেয়ে নে তারপর এক এক করে সব বলবো।ঘরে যেয়ে খাবার খেয়ে বসে বসে ভাবছি যে যাক আমার পরিবারের আমার প্রতি কোনো রাগ নেই।
তারা আমাকে এতো সহজ ভাবে মেনে নিবে এটা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিনি।
এগুলা চিন্তা করছি এমন সময় আম্মু আব্বু রুমে প্রবেশ করলো।আমি বল্লাম এসো তোমারা বসো। তারা বসলো এরপর বলতে শুরু করলো তোকে জেল হাজতে নেয়ার পর এলাকার লোকজন
আমাদের কে অনেক ধরনের অনেক বাজে কথা বলতো তাই আমরা সেই এলাকা ছেড়ে এখন গ্রামে এসে বসবাস করছি।
তোর বোনকেও এখান কার স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি।জিজ্ঞেস করলাম কলি কোন ক্লাসে পড়ে এবার আম্মু বল্লো ক্লাস ৭। আসলে আমি ভুলে গিয়েছি।
৫ বছর পরে এসেছি তাই স্মরণ নেই।
এরপর আব্বু আবার বলতে শুরু করলো তোকে আমরা জেল খানায় একটি বারের জন্যও দেখতে যাইনি কারণ আমরা তোকে তোর মামলা থেকে নিষ্পত্তি দিতে পারিনি।আর প্রিয়জন ছাড়া একা একা থাকা কতটা কষ্টের সেটা তোকে বুজাতে চেয়েছিলাম।আমি বল্লাম আব্বু আমি বুজে গিয়েছি প্রিয়জন ছাড়া আব্বু আম্মু ছাড়া থাকা কতটা কষ্টের।
আব্বু বল্লো এখন সব কথা বাদ দিয়ে বলতো তুই যার জন্য ৫ টি বছর জেল খাটলি সে কি তোর সাথে দেখা করতে গিয়েছে? আমি বল্লাম না আব্বু।কেনোরে?
ও কি তোকে ভুলে গিয়েছে জান্নাত কি তোর সব স্মৃতি ভুলে গিয়েছে? যার জন্য তুই সমাজের কাছে আজ অপরাধী ৫ বছরের জেল খাটা আসামি।
তোর জিবন বরবাদ সে আজ কোথায়?
আমি আব্বু কে বল্লাম আব্বু আমি যে জান্নাতের জন্য এতোকিছু করেছি সেটা কিন্তু জান্নাত জানেনা।
এটা নিশ্বয় তোমরা জানোনা।আমি জান্নাত কে আড়ালে থেকে সাহায্য করেছি।এবং কি তার জন্য যে আমি জেলে গিয়েছি এটাও সে জানেনা।
সে যদি সব জানতো তাহলে অবশ্যই আমার সাথে দেখা করতে আসতো।
আমি ওকে কথা গুলো বলার আগেই আমাকে জেলে যেতে হয়। আব্বু বল্লো ঠিক আছে তুই তাহলে এক কাজ কর তুই এখানে কিছুদিন থেকে জান্নাত কে খুজতে তোর জিবনে ঘটে যাওয়া সব কথা তাকে বলতে তুই শহরে যেয়ে তাকে খুজে বের কর।
তোর মনের সব কথা তুই জান্নাতকে বল।যেটা গত ১০ বছরেও তুই তাকে বলতে পারিসনি।
এরপর বাবাকে আমি বল্লাম বাবা তুমি কি জানো আমার যেই স্বপ্নের জন্য আমাকে জেলে যেতে হয়েছে আমার সেই স্বপ্ন পূরন হয়েছে। আমি এখানে আসার আগে জান্নাতদের বাড়িতে গিয়েছিলাম কিন্তু সেখানে তাকে পাইনি।
যারা ছিলো তারা আমাকে বলেছে জান্নাত নাকি শহরের নাম করা ডাক্তার হয়েছে।আর সেজন্যই তারা সে বাড়িটি ছেড়ে নতুন বাড়িতে গিয়ে উঠেছে। আমি তাদের কাছে জান্নাতের ঠিকানা চেয়েছিলাম কিন্তু তাদের কাছে জান্নাতের কোনো ঠিকানা ছিলো না।
তাই আর তাকে খুজে পাওয়া হয়নি। বাবা বল্লো ঠিক আছে বাবা মন খারাপ করিস না তুই শহরে যেয়ে জান্নাত কে খুজে বের কর আর তোর মনের সব কথা জান্নাত কে বল।
এই বলে বাবা মা রুম থেকে বের হয়ে চলে গেলো।
আমি খাটে হেলান দিয়ে জান্নাতের সাথে কাটানো দিন গুলোর কথা ভাবছি।গত ১০ বছর ধরে আমি তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে ভালোবাসি কিন্তু তাকে আমার ভালোবাসার কথা বলার সাহস পাইনি।
জান্নাতের পরিচয় দেই এখন।জান্নাত আমাদের মানে শহরে আমরা যেখানে থাকতাম আমাদের পাশেই কিছু ধুরেজান্নাতের বাড়ি ছিলো। জান্নাত আমার ২ বছরের ছোট। কিন্তু ২ বছরের ছোট হলেও আমরা সব সময় বন্ধুর মতো আচরণ করতাম।আমি যখন ক্লাস ৬ জান্নাত তখন ক্লাস ফোর সেখান থেকেই জান্নাতের সাথে আমার পরিচয়। এক কথায় জান্নাত আর আমি খুব ভালো বন্ধু ছিলাম।একসাথে থাকতাম, খেলতা,ঘুরতে যেতাম।এগুলো ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি।বিকেলে আম্মুর ঢাকে ঘুম ভাঙলো।
দুপুরের খাবার খেয়ে আমি একটু বাহিরে বের হয়েছি গ্রামের আত্বীয় স্বজনদের সাথে দেখা করতে। কিন্তু তারা কেও আমাকে ভালো ভাবে মেনে নিচ্ছে না।তাদের ভিতরে কেমন জানি অবহেলা অবহেলা ভাব।তারা আমাকে দেখেই না দেখার ভান করছিলো। ব্যাপারটা আমার মোটেও ভালোলাগেনি।তাই আবার,বাসায় চলে আসি।
এরপর আমি ২ দিন বাড়িতে ছিলাম কিন্তু একটি বারের জন্যও বাহিরে বের হইনি আর। সারাদিন আমার বোন আর আম্মু আব্বুর সাথে সময় কাটাতাম।৩ দিনের মাথায় আমি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আম্মু আব্বু বোন সবাইকে বিদায় জানিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেই।
চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ডে এসে চট্টগ্রামের সৌদিয়া গাড়িতে উঠি।গাড়িতে উঠেই আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাই।আমার পাশের সিটে যে বসবে মানে বসে আছে সে আর কেও নয় আমার স্কুলের প্রানপ্রিয় বন্ধু রায়হান।
রায়হান কে দেখে আমি খুব খুশি হই।রায়হান ও আমাকে দেখে খুব খুশি হয়।
রায়হান এর সাথে প্রায় ৬'৭ বছর পর দেখা আমি যে জেল খেটেছি সেটা কিন্ত রায়হান জানেনা।কারণ রায়হান এতোদিন ডুবাই ছিলো।
৫ বছর পর সে দেশে এসেছে। এটা রায়হান আমাকে বল্লো।সে পরে আমাকে প্রশ্ন করলো তুই এতোদিন কই ছিলি আর এখন কোথায় যাচ্ছিস।
আমি সোজা সাপ্টা বলে দিলাম আমি এতোদিন জেলে ছিলাম।৫ বছর জেল খেটে কিছুদিন আগে মুক্তি পেয়েছে। রায়হান এটা শুনে চমকে গেলো।
সে বলতিছে কি বলছিস তুই এটা??তোর মতো একটি ছেলে কেনো ৫ বছর জেল খাটলো??তোর ব্যাবহার স্বভাব চরিত্র সব কিছুইতো ভালো ছিলো। কারো সাথে কখনো মারামারিও করতি না......
আমি আমার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি। আমি বল্লাম বন্ধু এটাই নিয়তির খেল।
আল্লাহ কখন কাকে কোন অবস্তায় নিয়ে যায় সেটা আমরা কেওই জানিনা।
রায়হান বল্লো আচ্ছা তুই আমাকে সব খুলে বল।কি থেকে কি হলো কেনো তোর ৫ বছর জেল খাটা লাগলো সব বল আমাকে।আমি বল্লাম শুনবি তুই আমার সেই করুন কাহিনি? কেনো আমাকে ৫ বছর জেল খাটতে হয়েছিলো? সে বল্লো হ্যাঁ শুনবো। আমিও বলতে শুরু করলাম......
চলবে....
পর্ব ১
লেখাঃ- সম্পাদক
0 Comments