Header Ads Widget

Responsive Advertisement

"তাম্মি ফুল"



- একা একা তোমার কেমন কাটছে দিন?? 
- তুমি যতদিন আমার মাঝে লুকিয়ে থাকবে ততদিন আমি একা নই।

- এতো বেশি কেন বলো?? চুপ থাকতে পারোনা??
- যদি তোমার গল্প আমায় ছেড়ে যায়! তবে আমি নীরবতার পুরস্কার জিতবো। 

- এতো অবহেলা করি তবুও ভালবাসো কেনো?? 
- তোমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য।

- কিভাবে আমার ভালবাসা পাবে??
- সেটা জেনে গেলে তো আর অবহেলা করবেনা। 

- কথা না পেঁচিয়ে সোজা বলে ফেলো। তুমি জানো কৌতূহল চেপে রাখতে পারিনা।
- যেদিন আমি হারিয়ে যাবো! সেদিন তোমার অবহেলারা ভালোবাসার বিজ্ঞাপন নিয়ে আমার শহরে আমায় খুঁজবে। সেজন্যেই এত অবহেলার পরও ভালবাসি একটুকরো ভালবাসা পাওয়ার জন্য। 

- নতুন পেলে সবাই হারায়। তাই ভালবাসিনা কাউকে। তোমাকেও বাসব না। তুমি আগেই হারিয়ে যাবার কথা বলছো। 
- আমি নতুন পেয়ে হারাবো কে বলল তোমায়?

- সব ছেলেরাই এক। শুরুতে মিষ্টিকুমড়া, শেষে হয় তিতা করলা।
- হাহাহাহ। কয়টা ছেলেকে চেনো??

- তুমি যত যাই বলো আমার মন পাবেনা।
- পিপাসা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছ! নিজেকে বেঁধে রাখার এত ধৈর্য কোথায় পেলে?? 
- ধৈর্য না ছাই। আমি এখন যাই। বাই।
- হা,হা,হা। কবিতার এই অত্যাচারিত লাইনটা না বললে হয়না??

- যতদিন ইচ্ছে ততদিন বলব। কোন সমস্যা?? 
- নাহ, সমস্যা হবে কেন? ভালবাসা বেড়ে যায়। কষ্টও হয়।

- কম ভালবাসো তাহলে! ভালবাসা বুঝি আমার কবিতা শুনে বেড়ে যায়?? 
- ভালবাসা কখনো স্থির সমুদ্রজলের মত, যখন প্রিয়জনের সাথে কথা, সাক্ষাৎ, এবং আনন্দ বিনিময় বন্ধ থাকে। 
ভালবাসা কখনো উচ্ছলিত, যখন অপেক্ষায় রেখে প্রিয়জন দূরত্ব বাড়ায়। এবং আনন্দ ও কথার বিনিময় ঘটে। 

- এই বাটপার কবি! আমারে পটানোর চেষ্টা বন্ধ করবি! নাইলে কিন্তু চলে যাব একেবারে। 
- একদিন তোমার এই অপরাজিতা মন পরাজিত হবে। যার জন্য তুমি দূরে দূরে থাকছো। 

- কচু হবে, তোর মাথা হবে, ঘোড়ার আন্ডা হবে, হাগু হবে। ধ্যাত!  মিজাজটাই খারাপ। গেলাম, থাক তোর কবিতা মার্কা কথাবার্তা নিয়া।

প্রতিদিনই এভাবে কথা বলার মাঝে তামান্না হুট করে রেগে যায়। এটা তার অভ্যাস। যাবার আগে মুখে যা ইচ্ছে বকে যায় নাঈমকে।

নাঈম কিছু মনে করেনা তামান্নার এমন আচরণে। শান্ত স্বভাবী একজন মানুষ সে। সারাদিন বারান্দার ঝুলন্ত চেয়ারে বসে বই পড়া, আর ফুল বাগানের পরিচর্যা ছাড়া তার কোন কাজকর্ম নেই। 

নাঈমের আম্মু প্রায়শই দুপুর কিংবা রাতে খাবারের জন্য ডাকতে ডাকতে বিরক্ত হয়ে যায়। সেদিন ফাহাদকে নাঈমের আম্মু বলল,

- নানা ভাই! তোমার মামার গায়ে এই পানিটুকো ঢেলে দিয়ে আসো।

ফাহাদ গেলো তার মামার গায়ে পানি ঢালতে। গিয়ে দেখে তার মামা এক বিভোর ঘুমে নিমজ্জিত। মুখের উপরের বইটা ধিরেধিরে বুকের দিকটায় নেমে যাচ্ছে।  ফাহাদ ভাবলো বইটা না ভিজিয়ে বারান্দার দেয়ালে আগে সরিয়ে নিই। 

যেই ফাহাদ পানির পাত্র রেখে বইটা ধরতে যাবে! অমনি নাঈম খপকরে ফাহাদের হাতটা ধরে ফেলল। বলল,

- ভাগিনা! আমি চুপচাপ থাকি বলে সবাই বোকা ভাবো, তাইনা? 
- মামা তুমি যে শয়তানের খাড়াঝিলিকি এটা আগে থেকেই জানতাম। 

- হাহাহা। তোমার মামাকে তুমি চিনতে পারার জন্য তোমায় আজ বিকেলে ঘুরতে নিয়ে যাবো। চলো আমরা এখন যেয়ে খেয়ে আসি।

‘তোর জন্য আর খাবার নিয়ে টেবিলে অপেক্ষা করবোনা। পছন্দ থাকলে বলে দে, নয়তো আমি মেয়ে খুঁজতে আজই আত্মীয়স্বজন সবার কাছে ফোন করবো’। বলল নাঈমের আম্মু।

বিকেলে ফাহাদ আর নাঈম, বকুলতলায় বসে ফুসকা খাচ্ছে। ফাহাদ জিজ্ঞেস করলো,

- মামা! তোমার কি কেউ পছন্দের আছে?? 
- ছোট মানুষ ছোটদের মত থাকো! পাকনামি করনা।

- মামা! তুমি যেই পাকনার পাকনা! আমাকে বলো পাকনামি করি??
- চলো বাসায় ফিরতে হবে। সন্ধ্যা নেমেছে প্রায়। আমার কবুতরের ঘর বন্ধ করতে হবে।

- মামা! দাঁড়াও। কয়েকটা ফুল কুড়িয়ে নিই। নানুকে দেব। খুশি হবে অনেক।
- আচ্ছা নিয়ে নাও।

নাঈম ভাবলো ফেইসবুকটা একটু চেক করে নিই। যদি তামান্না লাইনে থাকে বিষয়টা তাকে জানাবে।

- হাই তাম্মি! আছো?? জরুরি একটা বিষয়।

নাঈম বাসায় ফেরার পর রাতে ঘুমাতে যাবে এমনসময় তামান্না অনলাইনে এলো।

- কি জরুরি বিষয় কবি সাহেব?? (বলল তামান্না।) 
- আম্মু জানতে চেয়েছে আমার পছন্দের কেউ আছে কিনা।

- তো! পছন্দের কেউ থাকলে বলে দাও? 
- তুমি তো জানো আমার পছন্দ শুধুই তুমি! 

- কেন বুঝনা! তোমার পছন্দ হলেই তো হবেনা! আমারও তোমাকে পছন্দ হতে হবে। কিন্তু আমি তোমায় পছন্দ করিনা। তোমার কাব্যিক কথাবার্তা আর আমাকে ভালবসার পাগলামিটাই শুধু ভালো লাগে।
- কিন্তু মাঝেমধ্যে তো কথাবার্তা শোনেও বিরক্ত হও! 

- বিরক্ত হই না। পটে যেতে ইচ্ছে হয় তাই চলে যাই। 
- এতো শক্ত তুমি? আমাকে আর কত অপমান করবে? 

- দেখো! আমাকে ভুলে যাও। আমার ফোন নাম্বার সহ সব ছবি ফোন থেকে ডিলেট করে দাও। ফেইসবুক ম্যাসেজ গুলোও ডিলেট করবে। আর হ্যাঁ তোমার আম্মুর পছন্দেই কিন্তু বিয়ে করবে। 
- সবকিছুই নাহয় ডিলেট করলাম। কিন্তু তোমায় মনে পরার কি হবে??

- ধিরেধিরে আমায় ভুলে যাবা। তোমার কবুতর গুলোর দেখাশোনা করনা। ফুল বাগানের যত্ন নিবা। বিশেষ করে ওই তাম্মি নামের ফুল গাছটা কেটে ফেলবা। যেটা আমার নামে নাম রেখেছিলে। বেশি বেশি উপন্যাসের বই পড়বা। তবুও ভুলে যাবা। আর এই গানটা আমায় মনে পরলে শোনবা, প্রেমে পরা বারণ। কারণে অকারণ।

নাঈম আর উত্তর দেয়নি সেদিন। দিনটা প্রথমে ঘড়ির খেয়ায় ২৪ ঘন্টা ফুড়ায়। ধিরেধিরে তামান্নার দেয়া নিয়মে সেই দিনটা একদিন সাপ্তাহিক ফেরিনৌকায় পা রাখে। এভাবেই একদিন মাস পেড়িয়ে মাসের সংখ্যা তিনে গড়ায়।

আজ আর তামান্নার সাথে নাঈমের সেই সম্পর্ক অবশিষ্ট নেই, যেই সম্পর্কের সময়টাতে কথায়-কথায় রাত ফুরিয়ে ভোর নেমে আসতো। 

২.
আগামীকাল সকালে নাঈমের বিয়ে। নাঈম ভাবছে তামান্নার ফেইসবুক আইডিটা একটু ঘুরে আসা যাক। কিন্তু তামান্নার সেই অভিমান আজও রয়ে গেল ব্লকলিস্টের কারাগে। অনেক খুঁজাখুঁজির পর নাঈম ঘুমিয়ে পরলো রাত ফুরাবার অপেক্ষায়।

তামান্না মাহাদির কাছে নাঈমের বিয়ের কথা জেনেছে আজই। মাহাদি নাঈমের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন। তামান্নার কেন জানি নাঈমের কথা আজ ভিষণ মনে পরছিল। সম্ভবত নাঈম যে তাকে খুব মিস করছে! সেজন্যেই হয়তো এই অকারণ অসময়ে নাঈমকে মনে পরছে তামান্নার।

তামান্না কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারছেনা নাঈম তাকে ছেড়ে বিয়েতে রাজি হয়েছে। তবুও মাহদি যেহেতু বলল, ‘সে জামাইয়ের গাড়িতে বসে তাকে সেলফি পাঠাবে’! এর মানে মাহদি মজা করেনি।

তামান্না আয়ানার টেবিলে বসে একটুকরো কাগজে লিখছে,

ভাগ্যবতী হয়তো সেই মেয়েটা, যাকে নিপুণ যত্নে কোন পুরুষ মানিয়ে রাখতে জানে। ভালোবাসা কখনো সত্য মিথ্যের হয়না। সত্য মিথ্যে হয় মানুষ। 

হে আমার প্রতিচ্ছবির আয়না! তুমি বলতে পারো! আমি কেমন মানুষ? ভাগ্যবতী! না সত্য? মিথ্যে! না অভাগা? 
আজ আমার এত দুঃখ হচ্ছে কেনো! নাঈম কে যদি এতটাই ভালবাসি! আগে তবে অবহেলা করেছিলাম কেন?

তামান্না আয়নার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে আছে। কিন্তু সে নিজেকে দেখছেনা। তার দু'চোখ অবাধ্য অশ্রুজলে ঝাপসা হয়ে পরেছে একপলক ব্যবধানেই। 

চোখ মুছতে মুছতে সে দেখলো কাগজের টুকরো টা ফ্যানের বাতাসে গড়াগড়ি খেয়ে ফ্লোর মুছা পানিতে ভিজে গিয়েছে। উঠাতে যাবে! এমনসময় কাগজটা মধ্যভাগ থেকে টুকরো হয়ে যায়। 

কাগজ টুকরোটা আবারও তামান্না ফ্যানের বাতাসে উড়িয়ে দেয়, এক লাইন গানের সুরে তুলে বলে,

‘ও আমার উড়াল পঙ্খিরে, যা, যা, তুই  উড়াল দিয়া যা’।

৩.
নাঈম বিয়ে করে বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছে। সে তার স্ত্রী ফারহানা নিয়ন্তীকে নিয়ে ফুল বাগানটা ঘুরে দেখতে এসেছে। নিয়ন্তী ফুল বাগানের প্রশংসা করে নাঈমকে বলল,

- ফুলকে যেভাবে পরম যত্নে নাকের ডগায় আগলে ধরো! সেভাবে আমায় তোমার বুকে একটু আঁকড়ে ধরবে?? 

নাঈম খুব শক্তভাবে জড়িয়ে ধরেছে নিয়ন্তীকে। তাম্মি ফুলের গাছটা বড্ড অযত্নে প্রায় মরে মরে। নাঈমের চোখ থেকে ক'ফোটা জল নিয়ন্তীর অগোচরে তাম্মির গায়ে ঝরে পরলো। নাঈম মনে মনে বলল,

এই ক'ফোটা জল কি তোমায় সুস্থ করবে! প্রিয় ‘তাম্মি ফুল’?? 

লিখা - মারুফুর রহমান (দুঃখ নিবাসী)

Post a Comment

0 Comments